হামাসের প্রতিরোধে পিছু হটেছে স্থলবাহিনী

হামাসের প্রতিরোধে পিছু হটেছে স্থলবাহিনী

আন্তর্জাতিক

অক্টোবর ৩১, ২০২৩ ১১:৪৮ পূর্বাহ্ণ

গাজা উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় ইসরাইলের বিমান হামলা কোনোরকম বিরতি ছাড়াই অব্যাহত রয়েছে। ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) প্রতিদিনের হামলা আগের দিনের চেয়ে তীব্র করছে। শনিবার রাতে ৪৫০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হলেও রোববার রাতে সে সংখ্যা ৬০০টিতে উন্নীত করেছে আইডিএফ। এর ফলে হামলার ২৪তম দিনে সোমবারও গাজার বিভিন্ন স্থানেই মুহুর্মুহু বিস্ফোরণের শব্দের পাশাপাশি ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে। এ হামলায় গাজার উত্তরাংশের অনেক এলাকায় ইন্টারনেট ও ফোন পরিষেবা ফের বন্ধ হয়ে গেছে। তবে হামাসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিভিন্ন স্থানে তারা ইসরাইলের হামলাকে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছেন। তাদের প্রতিরোধে ট্যাঙ্কসহ ইসরাইলের বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। খবর আলজাজিরা, এএফপি, রয়টার্স, স্কাই নিউজ, বিবিসির।

গাজার উত্তরাংশের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সোমবার প্রথম কয়েক ঘণ্টায় ইসরাইল তীব্র গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলা চালিয়েছে। আইডিএফের মুখপাত্র রিয়ার অ্যাডমিরাল ড্যানিয়েল হাগারি বলেছেন, গত রাতে ইসরাইল আরও পদাতিক সেনাকে গাজায় পাঠিয়েছে। সেখানে আমাদের অভিযান আরও জোরদারের লক্ষ্যেই এসব অতিরিক্ত সেনাকে পাঠানো হয়েছে। লড়াইয়ের কৌশলের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পদাতিক বাহিনী, ট্যাক, ভারী অস্ত্রসহ সমন্বিতভাবে আমরা এখন অভিযান পরিচালনা করছি। সন্ত্রাসীদের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে আমাদের আকাশ থেকেও সহযোগিতা করা হচ্ছে। এদিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও জানিয়েছেন, গাজায় স্থলসেনারা যে অভিযান চালাচ্ছে, তা সহজে বন্ধ হবে না। পরিস্থিতি খুব সহজে স্বাভাবিক হবে না। গাজার লড়াই শেষ হতে সময় লাগবে।

গাজার খান ইউনুসে ইসরাইলের হামলায় ২৪ ঘণ্টায় ৯৩ জন নিহত হয়েছেন। এদিকে ৭ অক্টোবর হামলা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত  ৩৪৫৭ শিশু, ২১৩৬ নারী এবং ৪৮০ প্রবীণসহ কমপক্ষে ৮৩০৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এতে আহত হয়েছেন ২১,০৪৮ জন। আর ১০৫০টি শিশুসহ ১৯৫০ জন ফিলিস্তিনি এতে নিখোঁজ রয়েছেন।

এদিকে ফিলিস্তিনের গণমাধ্যম জানিয়েছে, ইসরাইলি বিমানগুলো গাজা নগরীর শিফা ও আল কুদস হাসপাতালের আশপাশের এলাকাতে হামলা চালিয়েছে আর দক্ষিণে খান ইউনুস শহরের পূর্বদিকের সীমান্ত এলাকায় ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা সেনাদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে।

গাজা উপত্যকার মূল শহরের আশপাশের এলাকায় হামাস যোদ্ধাদের সঙ্গে ব্যাপক সংঘাত চলেছে ইসরাইলের স্থলবাহিনীর। দুপক্ষের সংঘাতে উপত্যকার উত্তরাংশের সঙ্গে দক্ষিণাংশের প্রধান সংযোগ সড়ক সালাহ আল দীন স্ট্রিট বন্ধ হয়ে গেছে। গাজা উপত্যকার প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছে, যে এলাকায় যুদ্ধ চলছে, সেখান থেকে গাজার মূল শহর মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরে। গাজার একজন বাসিন্দা এএফপিকে বলেন, ‘তারা (ইসরাইলি বাহিনী) সালাহ আল দীন স্ট্রিট দখল করেছে এবং ওই সড়ক দিয়ে যে যানবাহন যাচ্ছে, সেটিকে লক্ষ্য করে গুলি চালাচ্ছে।’

এদিকে আরেক খবরে জানা গেছে, হামাস যোদ্ধাদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার উপকণ্ঠে ঢুকে পড়া ইসরাইলি বাহিনীর ট্যাংক ও বুলডোজার। গাজায় ঢোকা ইসরাইলের সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে হামাসের তীব্র সংঘর্ষের জেরে ইসরাইলি ট্যাংক ও বুলডোজার গাজা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে বলে হামাসের সরকারি অফিসের প্রধান এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

সোমবার ফিলিস্তিনি একাধিক সূত্র আলজাজিরাকে বলেছে, ইসরাইলি ট্যাংকগুলো গাজার সীমান্ত থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে গাজা শহরের মধ্যবর্তী সালাহ আল দীন সড়কের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় আক্রান্ত হয়েছে। পরে ওই এলাকায় হামাসের যোদ্ধাদের সঙ্গে ইসরাইলি সৈন্যদের তুমুল লড়াই হয়।

গাজার স্থানীয় একজন বাসিন্দা এএফপিকে বলেছেন, ইসরাইলি সৈন্যরা সালাহ আল দূন স্ট্রিটের বিভিন্ন স্থান কেটে ফেলেছে এবং কোনো যানবাহন এই সড়ক দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেই সেটি লক্ষ্য করে তারা গুলি চালাচ্ছে।

গাজায় হামাসের সরকারি অফিসের প্রধান কর্মকর্তা সালামা মারুফ এক বিবৃতিতে বলেন, ‘গাজা উপত্যকার আবাসিক এলাকাগুলোতে ইসরাইলি বাহিনীর কোনো স্থল অভিযান নেই। সালাহ আল দীন সড়কে কেবল দখলদার সেনাবাহিনীর কয়েকটি ট্যাংক এবং একটি বুলডোজার অনুপ্রবেশ করেছিল।’ তিনি বলেন, ‘এসব যানবাহন সালাহ আল দীন স্ট্রিটে দুটি বেসামরিক গাড়িকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। পরে হামাসের যোদ্ধাদের প্রতিরোধে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে ইসরাইলি সব যানবাহন। চলে যাওয়ার আগে দখলদার বাহিনী সড়কের বিভিন্ন স্থান কেটে রেখে গেছে।’

এ বিষয়ে ইসরাইলের সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মুখপাত্র ড্যানিয়েল হাগারি বলেন, এ ব্যাপারে বিস্তারিত কোনো তথ্য দিতে পারবেন না। তবে তিনি বলেন, ‘সেনা সদস্যদের নিরাপত্তাই এখন আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’ হ্যাগারি বলেন, গাজায় আমরা অভিযান সম্প্রসারিত করেছি। পদাতিক বাহিনী, ট্যাংক, ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিট এবং গোলন্দাজ বাহিনীর পাশাপাশি বিমান বাহিনীও এ অভিযানে সহায়তা করছে।

ইসরাইল-গাজায় সেনা পাঠাবে না যুক্তরাষ্ট্র : মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস বলেছেন, ইসরাইল বা গাজায় সেনা পাঠানোর কোনো আগ্রহ ওয়াশিংটনের নেই। সিবিএস নিউজকে তিনি বলেন, ইসরাইল বা সিরিয়ায় আমাদের এ ধরনের কোনো আগ্রহ নেই বা আমরা এ ধরনের কোনো পরিকল্পনাও করছি না। ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ইসরাইলে ১৪০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কোনোরকম প্রশ্ন ছাড়াই ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে। তিনি আরও বলেন, হামাস ফিলিস্তিনিদের প্রতিনিধিত্ব করে না এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফিলিস্তিনিদেরও সমান নিরাপত্তা ও সুরক্ষা, আত্মমর্যাদা রক্ষার অধিকার রয়েছে।

গাজায় ৪৭টি মসজিদ ও ৭টি গির্জা ধ্বংস : ইসরাইলের চলমান বিমান হামলায় ৪৭টি মসজিদ এবং সাতটি গির্জা ধ্বংস হয়েছে বলে জানিয়েছে গাজার মিডিয়া অফিস। গত তিন সপ্তাহে ২০৩টি স্কুল এবং ৮০টি সরকারি অফিসও ধ্বংস করেছে ইসরাইল। ব্যাপক বোমা হামলার কারণে ২ লাখ ২০ হাজার আবাসন ইউনিট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ৩২ হাজার ভবন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।

গাজায় আরও ৩৩ ট্রাক ত্রাণ : অবরুদ্ধ গাজায় রোববার আরও ৩৩ ট্রাক ত্রাণ ঢুকেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের মানবিক সংস্থা ওসিএইচএ জানিয়েছে, মিসরের সঙ্গে রাফাহ সীমান্ত দিয়ে রোববার ত্রাণবাহী ৩৩ ট্রাক প্রবেশ করে। এসব ট্রাকে ছিল পানি, খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী। জাতিসংঘের সংস্থাটি বলেছে, ৭ অক্টোবর হামলা শুরুর পর এখন পর্যন্ত মিসরের রাফাহ ক্রসিং দিয়ে গাজায় ত্রাণবাহী ১১৭টি ট্রাক ঢুকেছে। যদিও সেটি গাজার প্রায় ২৪ লাখ মানুষের জন্য অপ্রতুল। অবরোধের আগে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ ট্রাক সাহায্য এবং অন্যান্য পণ্যবাহী ট্রাক গাজায় প্রবেশ করত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *